মেনু নির্বাচন করুন

জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ

জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ
 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা
 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, ১৪ ফাল্গুন ১৪১৫


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
 

আমার প্রিয় দেশবাসী,

            আসসালামু আলাইকুম।

            প্রায় সাত বছর পর পুনরায় আপনাদের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হতে পেরে আমি সর্বাগ্রে পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার নিকট অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

            ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও সশস্ত্র বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। যার ফলে জনগণ তার ভোটের অধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে। এবং আমরা নির্বাচিত হয়েছি।

            আমি নতুন ও পুরাতন সকল ভোটারকে অভিনন্দন জানাই। দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। সকলকে অভিনন্দন জানাই এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।

            লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই আমাদের মূল কর্তব্য। আমরা আপনাদের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে গড়ে তুলতে চাই।

            আমি জানি, বিগত বছরগুলোতে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আপনাদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।

            আপনাদের মাঝে নিম্ন আয় ও সীমিত আয়ের যাঁরা, তাঁদের সংসার চালানোই ছিল কষ্টকর। দু'বেলা দু'মুঠো খাদ্য জোগাড় করাই ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের দুঃসাধ্য। আমি জানি, অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে আপনাদের দিন যাপন করতে হয়েছে।

            আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা মানুষের জীবনের সমস্যা দূর করার অঙ্গীকার করেছি এবং দিন বদলের আহ্বান জানিয়েছি। আপনারা আমাদের সেই ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমাদের সরকারের মেয়াদ মাত্র ৫০ দিন। এরই মধ্যে আমরা চাল, ডাল, তেল, সার, কেরোসিন, ডিজেলসহ অনেক জিনিসের দাম কমিয়ে আপনাদের ক্রয় ক্ষমতার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছি। দ্রব্যমূল্য সহনশীল পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করেছি। বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সমস্যা সমাধান করারও যথাযথ পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করেছি।  

প্রিয় দেশবাসী,

            জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা, এটাই আমাদের সরকারের কর্তব্য। এবং এই কর্তব্য পালনে আমি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি। গণতন্ত্র ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া দেশবাসী উন্নত জীবন অর্জন করতে পারে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান-এর ব্যবস্থা করে সকলের জীবনের উন্নতি সাধন করাই আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য।

            জনগণের উন্নতির লক্ষ্যে যখন আমাদের সরকার কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কিছু অবাঞ্ছিত ঘটনা পরিবেশ নষ্ট করছে। দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে আমার অনুরোধ, জাতির বৃহৎ স্বার্থে এমন কোন মন্তব্য, বক্তব্য বা কার্যক্রম হাতে নিবেন না, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।

প্রিয় দেশবাসী,

            আপনারা জানেন, গতকাল ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আমি অত্যন্ত মর্মাহত। আত্মঘাতি এই হানাহানিতে জীবন দিতে হয় আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা, বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের। এই প্রাণহানির ঘটনায় আমি দারুণভাবে মর্মাহত ও দুঃখিত। আমি নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাঁদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই তা তদারকি করছেন। এই ঘটনার সাথে সাথে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমাদের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও হুইপগণ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁরা তৎক্ষণাৎ পিলখানায় গমন করেন এবং বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। বিডিআর-এর একটি দল আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের দাবী-দাওয়া তুলে ধরেন এবং সাধারণ ক্ষমার আবেদন করেন। আমি তাঁদের সমস্যার কথাগুলি গভীর মনযোগের সাথে শ্রবণ করি। তাঁদের এই আত্মঘাতী সংঘাত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। অস্ত্র সমর্পণ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অনুরোধ করি। তাঁদের সাধারণ ক্ষমারও ঘোষণা দেই। আটক পরিবারগুলোকে মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানাই। তাঁরা আমার কথা মেনে নেন। আমি শক্তি প্রয়োগ নয়, আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছি যে তাঁদেরকে সাধারণ ক্ষমা দেওয়া হবে। অন্যান্য দাবী-দাওয়া পর্যায়ক্রমে মেনে নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছি। পেশাগত সমস্যারও সমাধান করা হবে। আমি বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং সশস্ত্র বাহিনীকে যে কোন স্বার্থান্বেষী মহলের উস্কানীমূলক প্ররোচনা থেকে নিজেদের বিরত রাখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। নানা ধরণের গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টাও মহলবিশেষ করছে। সে বিষয়েও সকলকে সজাগ থাকার আমি অনুরোধ জানাই। কোন মতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। চেইন অব কমান্ড মেনে চলতে হবে। দেশের স্বার্থে, নিজেদের স্বার্থে, নিজের পরিবারের স্বার্থে সকলকে ধৈর্য ধারণ করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।

            একটি বিষয় আপনাদের অনুধাবন করতে হবে, স্বজন হারানোর বেদনা যে কত কঠিন তা আমার থেকে কেউ বেশি উপলব্ধি করতে পারে না। কাজেই আপনারা যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন আমি জানি কত ব্যথা, বেদনা আপনাদের মনে।  এমনি অবস্থায়ও আমি আশা ক'রব, কোন আত্মঘাতী সংঘাতের পথ আপনারা বেছে নিবেন না। এই পথ পরিহার করার জন্য আমি বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমার প্রশ্ন, কার বুকে গুলি চালাবেন? তাঁরা তো আপনারই ভাই। ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকে গুলি করবেন না। আপনার বোনকে বিধবা করবেন না। পিতা-মাতাকে সন্তানহারা করবেন না। এই আত্মঘাতী সংঘাত আপনারা বন্ধ করুন। আমরা আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। এমন পথ নিবেন না যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। আমাকে দেশের স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করবেন না। মনে রাখবেন, সংঘাত আরও সংঘাত বাড়ায়। আপনারা সংযত হোন। অস্ত্র সমর্পণ করুন। আপনাদের কোন ক্ষতি হবে না, আমি আশ্বস্ত করছি। আমরা যাঁদের হারিয়েছি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে তাঁদের পরিবারের। এ কথা নিশ্চয়ই আপনারা অনুধাবন করেন। এই ক্ষতি পূরণ করা যায় না, আমি জানি। কিন্তু এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরও বেশি ক্ষতি হোক, সেটাও আমি চাই না। সকলকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি। দেশের জনগণের স্বার্থে শান্তি বজায় রাখুন, এই আমার আহ্বান।

            বিডিআর-এর সমস্যা সমাধানের জন্য মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এই কমিটি আপনাদের সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখবে এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আপনারা এই মুহূর্তে অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যান, অন্যথায় আমি দেশবাসীর স্বার্থে যে কোন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হ'ব। আমাকে বাধ্য করবেন না, এই আমার অনুরোধ।

            আমি দেশবাসীর সহযোগিতা  চাই, দেশবাসীর দোয়া চাই। দেশবাসীর কল্যাণে আমি কাজ করে যা'ব, এই আমার অঙ্গীকার।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।


Share with :

Facebook Twitter